ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে বিজয়োল্লাস দেখিয়েছেন, তা যেন অতীতেরই পুনরাবৃত্তি।
২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় সাদ্দাম হুসেইন গ্রেফতারের পর ঠিক এমনই আত্মবিশ্বাসী ঘোষণা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তখন বলা হয়েছিল, যুদ্ধ প্রায় শেষ। কিন্তু বাস্তবে সেই ‘জয়’ ইরাককে ঠেলে দিয়েছিল দীর্ঘ অস্থিরতা, সহিংসতা ও ধ্বংসের দিকে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের বর্তমান নীতিতে সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি স্পষ্ট। সোমবার দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই তথ্য।
৩ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, মার্কিন বাহিনী অভিযানে মাদুরোকে আটক করেছে এবং তাকে যুক্তরাষ্ট্রে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, ভেনেজুয়েলার অন্য রাজনৈতিক ও সামরিক নেতারাও লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন। ট্রাম্পের ভাষায়, মাদুরোর পতনের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার মানুষ আবার ‘মুক্ত’ হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠছে-একজন শাসককে সরালেই কী একটি দেশ প্রকৃত অর্থে ‘মুক্ত’ হয়?
ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এ বিষয়ে ভিন্ন কথা বলে। সাদ্দাম হুসেইনকে সরানোর পর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দেশটি পরিচালনার স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা ছিল না। ফলে ইরাকের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ে, নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে এবং বিদ্রোহ ও গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। বহু বছর ধরে ইরাক অস্থির থাকে, আর যুক্তরাষ্ট্রকে গুনতে হয় বিপুল অর্থ ও প্রাণহানি। ভেনেজুয়েলায়ও বর্তমানে একই আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার ভেতরের রাজনৈতিক বিভাজন ও সহিংসতার সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে না। মাদুরো-সমর্থিত চাভিস্তা গোষ্ঠীর হাতে রয়েছে সশস্ত্র মিলিশিয়া, যারা রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয়। ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হলে এই শক্তিগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ বাড়তে পারে, যা দেশটিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে।
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো তেল। ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদ দিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ ও পুনর্গঠনের খরচ উঠে আসবে। ইরাক যুদ্ধের সময়ও এমন আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, জীর্ণ তেল অবকাঠামো, নিরাপত্তাহীনতা ও বিনিয়োগের অভাবে সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। এরপর ইরাক যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও তেল উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে গেছে এবং অবকাঠামো পুনর্গঠনে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন।
সমালোচকদের মতে, ট্রাম্পের ঘোষণায় ভেনেজুয়েলার তেল আয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ইঙ্গিত যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে আরও বিতর্কিত করে তুলেছে। এতে মানবিক সহায়তা বা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যুক্তির বদলে অর্থনৈতিক স্বার্থই মুখ্য হয়ে উঠছে।
সবমিলিয়ে মাদুরোকে আটক করা ট্রাম্পের জন্য তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সাফল্য হতে পারে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, এমন ‘দ্রুত জয়’ অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সূচনা করে।
ইরাকের অভিজ্ঞতা সামনে রেখে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, ভেনেজুয়েলায় ভুল পদক্ষেপ নিলে যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির জনগণ-উভয়কেই এর চড়া মূল্য দিতে হতে পারে।

