বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর কথিত হামলার গুঞ্জনে মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেয় ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ড (বিসিসিআই)। মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ আইসিসিকে জানায়, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আসন্ন টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতে ম্যাচ খেলতে আগ্রহী নয় এবং সহ-আয়োজক দেশ শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ আয়োজনের অনুরোধ জানায়।
আসন্ন আইসিসি টি-টুয়েন্টি ওয়ার্ল্ড কাপে বাংলাদেশ দলের সবথেকে বেশি ম্যাচ খেলার কথা ছিল কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে। কলকাতায় বাংলাদেশের খেলতে না আসার সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে কলকাতার ক্রিকেট মহলে। খবর বিবিসি বাংলার।
কলকাতার ক্রিকেট ভক্ত আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোস্তাফিজুর রহমানকে নিলামে তুলে, দলে নিয়েও তারপরে না খেলতে দেওয়াটা অনুচিত হয়েছে বিসিসিআইয়ের। কলকাতার ‘এই সময়’ পত্রিকার ক্রীড়া সাংবাদিক ও কলকাতা স্পোটর্স জার্নালিস্টস ক্লাবের সচিব অর্ঘ্য ব্যানার্জী বলেন, নিলামের আগেই যদি বিসিসিআই ঘোষণা করত যে বাংলাদেশি প্লেয়ারদের খেলানো যাবে না, তাহলে তো ব্যাপারটা এতদূর গড়াত না। আগেই সামলিয়ে নেওয়া যেত। যে-রকম পাকিস্তানের প্লেয়ারদের খেলতে দেয় না, সেরকম বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ব্যাপারে আগেভাগেই জানাতে পারত বিসিসিআই।
ক্রিকেটপ্রেমীরা বলছেন, কট্টরপন্থিদের চাপের মুখে মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছে বিসিসিআই, সেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত খেলার মাঠে চাপিয়ে না দেওয়াটাই বাঞ্ছনীয় ছিল। তবে অনেকে বলছেন, রাজনীতি আর কূটনীতি সব খেলাকেই প্রভাবিত করে, তাই ক্রিকেট মাঠ তার থেকে আলাদা কীভাবে থাকবে?
ক্রিকেটের মাঠের ওপরে এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার ব্যপারে গণমাধ্যমে জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন নির্বাচক সম্বরণ ব্যানার্জী বলেন, বাংলাদেশে যা ঘটে চলেছে, হিন্দুদের ওপরে নিয়মিত নির্যাতন হচ্ছে, সেদিক থেকে দেখতে গেলে হয়ত মোস্তাফিজুরকে খেলতে না দেওয়াটা ঠিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু কলকাতা নাইট রাইডার্সে নেওয়ার আগে সেটা জানালে ভালো হত। তবে আমার মতে খেলার মাঠে রাজনীতি আসাটা অনুচিত। কোনও প্লেয়ারকেই বঞ্চিত করাটা উচিত নয়। আমাদের কাছে খেলাটাই তো সব – খেলতে বাধা দেওয়া ঠিক না।
ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতায় মেডিক্যাল ভিসা ছাড়া বাংলাদেশিদের একরকম ভিসাই দেওয়াই বন্ধ রেখেছে ভারত। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের সমর্থকদের নিরাপত্তা দেওয়া যাবে কিনা, সেই প্রশ্নও তুলেছেন অনেকে।
সরকারি কর্মচারী শান্তনু রায় বলেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের যেসব অভিযোগ মোস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে বাদ দেওয়ার যে দাবি উঠেছিল, এই দাবি কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গে থেকে খুব বেশি না উঠলেও ভারতের অন্যান্য প্রান্তের বিজেপি নেতাদের একাংশ থেকেই আসে।
টেলিকম শিল্পের একজন বিশেষজ্ঞ ও ক্রিকেট ফ্যান অমিতাভ বিশ্বাসের গণমাধ্যমে বলেন, মোস্তাফিজুর রহমানের ব্যাপারে বিসিসিআই যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটা তো আদতে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত। এটা অনুচিত হয়েছে। বিসিসিআই তো আগে ঠিক করতে পারত যে পাকিস্তানের মতোই বাংলাদেশের কোনও প্লেয়ারকে নিলামে তোলা যাবে না! তবে বাংলাদেশও ভুল করতে যাচ্ছে – একটা ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের সঙ্গে আইসিসি টুর্নামেন্ট গুলিয়ে ফেলছে তারা। এতে দীর্ঘমেয়াদে কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটারদেরই ক্ষতি হবে, কারণ এরকম একটা টুর্নামেন্টে যে এক্পোজার পাওয়া যায়, সেটা থেকে বঞ্চিত হবে।
বাংলাদেশের ভারতে খেলতে না আসার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার ফলে কলকাতাকে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে বলে মনে করছেন সবাই। কারণ হিসাবে তারা বলছেন কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে বাংলাদেশের যে তিনটি ম্যাচ খেলার কথা ছিল। কিন্তু এখন হয়ত বদলি ম্যাচ আর নাও পেতে পারে কলকাতা। এছাড়াও বাকি তিনটি ম্যাচের মধ্যে একটি ইতালির সঙ্গে ইংল্যান্ডের, দ্বিতীয়টি ইতালি আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের এবং অন্যটি সুপার এইটের ম্যাচ। বিশ্লেষকরা বলছেন যে গ্রুপ পর্যায়ের ইতালির ক্রিকেট দেখতে মানুষের হয়ত বিশেষ আগ্রহ থাকবে না। প্রাক্তন জাতীয় ক্রিকেটার উৎপল চ্যাটার্জীর কথায়, এখন তো কলকাতার দর্শকের আর বিশেষ উৎসাহই থাকবে না গ্রুপ পর্যায়ের ম্যাচ দেখার।
ক্রীড়া সাংবাদিক অর্ঘ্য ব্যানার্জী বলছিলেন, ইতালি ফুটবলে অন্যতম বিশ্বসেরা, কিন্তু তাদের ক্রিকেট? কে দেখবে? কলকাতায় তো আর তেমন ভালো ম্যাচ পড়েনি। সৌরভ গাঙ্গুলি বিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন এই পরিস্থিতিতে তিনি কলকাতার জন্য কিছু একটা নিশ্চয় করতেন। তবে এখন মনে হয় না ইডেনের নতুন করে অন্য ম্যাচ পাওয়ার সুযোগ আছে। আমার জানা মতে শ্রীলঙ্কাকে অনুরোধ করা হয়েছিল যে বাংলাদেশের ম্যাচগুলি যদি তারা ভারতে এসে খেলে। কিন্তু শ্রীলঙ্কাও তো যৌথ আয়োজক দেশ। তারা নিজের দেশ ছেড়ে ভারতে খেলতে স্বাভাবিকভাবেই রাজি নয়।
কলকাতার পেশাজীবী সুজাতা ঘোষ বলেন, ভারত আর বাংলাদেশের এখন যা সম্পর্ক, তাতে তাদের মনে হতেই পারে যে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। আমাদের কেন্দ্রীয় সরকার হিন্দুত্বের কথা বললেও ভারতের কূটনীতি কিন্তু কোনও মুসলিম দেশের সঙ্গে বৈরিতা তৈরি করেনি। কিন্তু বাংলাদেশ আমাদের ওপরে ভরসা করতে পারল না!
জয়ন্ত চক্রবর্তী মনে করেন যে বাংলাদেশের সমর্থকদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ার প্রসঙ্গটাই অবান্তর। তার কথায়, একটা সময়ে বাংলাদেশের ম্যাচ থাকলে সেদেশের সমর্থকরা কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকা, ওখানকার হোটেলগুলো সব ভরিয়ে ফেলতেন। এবারে সেটা আর হওয়ার সুযোগ নেই, কারণ ভারত তো বাংলাদেশিদের মেডিক্যাল আর খুব বিশেষ কারণ ছাড়া ভিসাই দিচ্ছে না।
কলকাতার বাসিন্দা, ব্যবসায়ী আর ক্রিকেট ভক্ত তথাগত চ্যাটার্জী শহরের ব্যাবসা বাণিজ্যের ক্ষতির কথা উল্লেখ করছিলেন। তিনি বললেন, দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটা সত্যি যে বিশ্ব-রাজনীতিতে সম্পর্কের অবনতির প্রথম আঘাতটা আসে খেলাধুলোর ওপরেই। তবে দুই দেশেই ধর্মীয় উন্মাদনার একটা পরিবেশের কারণে ভারতে খেলতে না আসার যে সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ নিল, তাতে কলকাতার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়ে যাবে। এমনিতেই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির পর থেকে কলকাতার নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ী বলুন বা হাসপাতাল-শিল্প – সামগ্রিক ভাবে ব্যাবসা-বাণিজ্যে।
উল্লেখ্য, ভারত সরকারের অনুমোদন নিয়েই আইপিএল কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের নিলামে তোলে। সেই নিলাম থেকেই ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে মোস্তাফিজুর রহমানকে দলে নেয় কলকাতা নাইট রাইডার্স। তবে ভারতের কট্টরপন্থীদের চাপের মুখে বিসিসিআইয়ের নির্দেশে পরে কলকাতা মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়া হয়।

