ঢাকাMonday , 19 October 2026
  1. # লিড নিউজ
  2. অপরাধ
  3. অর্থনীতি
  4. আইন-আদালত
  5. আন্তর্জাতিক
  6. ইতিহাস ও ঐতিহ্য
  7. খেলাধুলা
  8. গণমাধ্যম
  9. জাতীয়
  10. তথ্যপ্রযুক্তি
  11. দেশজুড়ে
  12. ধর্ম
  13. ফিচার
  14. বিনোদন
  15. ভ্রমণ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আইলা-আম্পানের ক্ষত এখনো শুকায়নি, দুর্যোগের সঙ্গে লড়ছে কয়রার মানুষ

মো:এমদাদুল হক
October 19, 2026 12:55 pm
Link Copied!

ঘূর্ণিঝড় আইলা ও আম্পানের আঘাতের ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন খুলনার সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় উপজেলা কয়রার মানুষ। একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের কারণে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি অনেকেই। কেউ হারিয়েছেন বসতভিটা, কেউ কৃষিজমি ও জীবিকার অবলম্বন। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও অনেক পরিবারের ঠাঁই হয়নি নিজেদের ঘরে। এখনো বেড়িবাঁধের ওপর ঝুপড়িতে বসবাস করছেন অনেকে।

২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলা ও জলোচ্ছ্বাসে কয়রা উপজেলার ২৭টি স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে ছয়টি ইউনিয়ন লবণপানিতে প্লাবিত হয়। প্রাণহানির পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষতি হয় ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট, কৃষিজমি, মাছের ঘের ও গাছপালার। দীর্ঘ সময় লবণপানির সঙ্গে লড়াই করতে হয় স্থানীয়দের। আইলার ১৬ বছর পরও ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।

এর ১১ বছর পর, ২০২০ সালের ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে আবারও বিপর্যস্ত হয় কয়রা। কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীর বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। পানিবন্দী হয়ে পড়েন প্রায় দেড় লাখ মানুষ। উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, আংশিক ও সম্পূর্ণ মিলিয়ে প্রায় ৩৮ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া তিন হাজার হেক্টর ফসলি জমি এবং চার হাজার হেক্টর মাছের ঘের লবণপানিতে তলিয়ে যায়।

সরেজমিনে কয়রার দক্ষিণ বেদকাশী, উত্তর বেদকাশী, কয়রা সদর ও মহারাজপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসে ঘরবাড়ি হারানো অনেক পরিবার এখনো বেড়িবাঁধের ওপর ঝুপড়ি তুলে বসবাস করছে। কাটমারচর, হাজতখালী, গাতিরঘেরী ও হরিণখোলাসহ বিভিন্ন এলাকায় আম্পানের সময় বাঁধ ভেঙে সৃষ্ট খালগুলোতে এখনো পানি জমে থাকতে দেখা যায়। অনেক জমিতে লবণাক্ততার প্রভাব রয়ে গেছে। জীবিকার সংকটে কেউ দিনমজুরি করছেন, কেউ সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরে সংসার চালাচ্ছেন। অনেকে বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছেন।

কয়রা সদর ইউনিয়নের ৪ নম্বর কয়রা গ্রামের হেলাল উদ্দিন বলেন, আইলার পর অনেক জনপ্রতিনিধি পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে নদীর চরে বসবাসকারী অনেকের জমিজমা থাকায় তাঁরা নিজেদের জায়গা ছেড়ে যেতে চান না। আবার যাঁদের জমি নেই, দীর্ঘদিন বসবাসের কারণে তাঁরাও ওই জায়গার প্রতি মায়া তৈরি হওয়ায় অন্যত্র যেতে আগ্রহী নন।

উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের শেখ সরদারপাড়া গ্রামের কৃষক আরিফুর রহমান বলেন, আইলার পর কয়েক বছর ধরে কিছু জমিতে ফসল উৎপাদন সম্ভব হলেও এলাকার লবণাক্ততা পুরোপুরি দূর হয়নি। অনেক স্থানে বেড়িবাঁধ মেরামত করা হলেও এখনো ঝুঁকি রয়ে গেছে। বাঁধ টেকসইভাবে সংস্কার না করলে যেকোনো সময় আবারও লবণপানিতে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আম্পানের রাতে কপোতাক্ষ নদের বাঁধ ভেঙে ভেসে যায় কাটমারচরসহ আশপাশের এলাকার ঘরবাড়ি ও সম্পদ। অনেক পরিবার আশ্রয় নেয় বেড়িবাঁধে। কেউ কেউ পরে নিজ উদ্যোগে ঘরবাড়ি নির্মাণ করে ফিরলেও অনেকে এখনো নিরাপদ আশ্রয় পাননি।

কাটমারচর গ্রামের সাইফুল্লাহ ঢালী বলেন, আম্পানের আগে দিনমজুরি করে ভালোভাবেই সংসার চলত। ঝড়ের রাতে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে প্রথমে একটি স্কুল ভবনে আশ্রয় নেন। পরে পানি বাড়তে থাকায় পরিবারসহ কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধে আশ্রয় নিতে হয়। সেই রাতের পর আর আগের জীবনে ফিরতে পারেননি তিনি।

সাইফুল্লাহ বলেন, “আম্পান আমার সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। ঝড়ের রাতে ঘাড়ে আঘাত পেয়েছিলাম। সেই থেকে ভারী কাজ করতে পারি না। এখন নদীতে মাছ ধরে কোনোমতে সংসার চালাই।”

হাজতখালী গ্রামের পরিমল মণ্ডল জানান, আম্পানে তাঁদের চার বিঘা জমির বসতভিটার অধিকাংশই নদীর স্রোতে ভেসে গেছে। এখন মাত্র তিন শতাংশ জমি অবশিষ্ট আছে। বাঁধ ভেঙে গোটা গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় বহু পরিবার বেড়িবাঁধে আশ্রয় নেয়। টানা ছয় মাস অনেক পরিবার ঠিকমতো রান্না ও খাওয়াদাওয়া করতে পারেনি। পরে কেউ ঘরে ফিরেছেন, কেউ অন্যত্র চলে গেছেন, আবার অনেকে এখনো বাঁধের ওপর বসবাস করছেন।

কাশিরহাটখোলা এলাকায় আম্পানে গৃহহারা কয়েকটি পরিবারকে হাটের খুপরি দোকানে বসবাস করতে দেখা যায়। স্থানীয় ফুলবাসী সরদার বলেন, “আগে জমি, বসতভিটা সবই ছিল আমাদের। এখন আমরা হাটখোলার খুপরি ঘরের বাসিন্দা।”

আম্পানের পর কয়রার অনেক এলাকার কৃষিজমিতে লবণাক্ততার প্রভাব পড়ে। কোনো কোনো জমিতে ধান চাষ করা কঠিন হয়ে পড়ায় কৃষকেরা চিংড়ি চাষে ঝুঁকেছেন। অনেক জমি ও মাছের ঘের এখনো পুরোপুরি চাষের উপযোগী হয়নি। একের পর এক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবিকাও সংকুচিত হয়েছে।

কাশিরহাটখোলা এলাকার নিলকান্ত সরদার বলেন, আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত কয়রা-কাশিরহাট সড়ক দীর্ঘদিনেও সংস্কার করা হয়নি। এলাকায় চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা, সুপেয় পানির সংকট এবং বেড়িবাঁধের নাজুক অবস্থা মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। তিনি পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।

কয়রা সদর ইউনিয়নের গোবরা গ্রামের আত্তাপ আলী শেখ বলেন, আম্পানের পরও একাধিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হয়েছে তাঁদের। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের আঘাতে নতুন করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এলাকার মানুষ। ফলে আগের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই তাঁদের আবারও দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয়েছে।

আইলা ও আম্পানের প্রভাবে কয়রার বিভিন্ন এলাকায় সুপেয় পানির সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। অনেক মানুষকে দূরদূরান্ত থেকে নলকূপের পানি সংগ্রহ করতে হয়। কোথাও কোথাও পুকুর সংস্কার ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উপযোগী ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

কয়রা সদর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এস এম লুৎফর রহমান বলেন, আইলার পর কর্মসংস্থানের অভাবে অনেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে গেছেন। তাঁদের অনেকেই এখনো নিজ এলাকায় ফিরতে পারেননি। টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে গভীর নলকূপ স্থাপন ও পুকুর সংস্কার করে পানি পরিশোধনব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে সুপেয় পানির সংকট কমানো সম্ভব।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা তপন কুমার কর্মকার জানান, আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংস্কার করা হলেও বরাদ্দের অভাবে কিছু প্রতিষ্ঠান এখনো জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বিদ্যালয়ে যাতায়াতের রাস্তাঘাট পুরোপুরি সংস্কার না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

কয়রা উন্নয়ন সমন্বয় সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ উদ্দিন বলেন, নদীভাঙন কয়রার অন্যতম প্রধান সমস্যা। বিভিন্ন স্থানে বেড়িবাঁধ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দ্রুত এসব স্থান সংস্কারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের খুলনার উপসহকারী প্রকৌশলী মশিউল আবেদীন বলেন, কয়রার ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের কয়েকটি স্থানে বিভিন্ন প্যাকেজের আওতায় কাজ চলছে। অন্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সেসব স্থানেও কাজ করা হবে।

উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসচিব ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মামুনার রশিদ বলেন, ২০০৯ সালের ২৫ মে আইলায় সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রা উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। সেই ক্ষতি এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি স্থানীয় বাসিন্দারা।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুলী বিশ্বাস বলেন, নদীবেষ্টিত কয়রায় প্রতিবছর কোথাও না কোথাও বেড়িবাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হয়। মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের বিকল্প নেই।

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তারিক উজ জামানও বলেন, উপজেলার তিন দিক নদীবেষ্টিত হওয়ায় ছোটখাটো দুর্যোগেও বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনে সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলো কাজ করছে। বেড়িবাঁধে বসবাসকারীদের পুনর্বাসনের চেষ্টাও চলছে।

আইলা ও আম্পানের পর বহু বছর পেরিয়ে গেলেও কয়রার মানুষের কাছে দুর্যোগের স্মৃতি এখনো বাস্তব জীবনের অংশ। নদীভাঙন, লবণাক্ততা, সুপেয় পানির সংকট ও কর্মসংস্থানের অভাব তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাই শুধু ভাঙা বাঁধ মেরামত নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নিরাপদ আবাসন, সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং বিকল্প কর্মসংস্থান। এসব উদ্যোগ কার্যকর না হলে দুর্যোগের ক্ষত নিয়ে কয়রার মানুষের এই দীর্ঘ লড়াই শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।